আশপাশে প্রায়ই এমন কিছু মানুষকে দেখা যায়, যাদের ত্বকের রঙে সাদা ছোপ ছোপ দাগ থাকে। এটি আসলে শ্বেতী রোগ, যা ইংরেজিতে লিউকোডারমা বা ভিটিলিগো নামে পরিচিত। এটি ত্বকের একটি দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা, যেখানে শরীরের নির্দিষ্ট কিছু অংশে মেলানিন উৎপাদন কমে যায় বা বন্ধ হয়ে যায়, ফলে ত্বকের স্বাভাবিক রঙের সঙ্গে সাদা দাগ দেখা যায়।
শ্বেতী রোগ কী ছোঁয়াচে?
অনেকেরই ভুল ধারণা রয়েছে যে শ্বেতী রোগ ছোঁয়াচে। তবে এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। শ্বেতী কোনো সংক্রামক রোগ নয়, এটি একধরনের অটোইমিউন ডিজঅর্ডার। অর্থাৎ, রোগটি একজন থেকে আরেকজনের শরীরে ছড়ায় না।
শ্বেতী রোগ কেন হয়?
শ্বেতী রোগ মূলত শরীরের ইমিউন সিস্টেমের সমস্যার কারণে হয়। সাধারণত শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিজেরই মেলানোসাইট নামক কোষগুলোর ওপর আক্রমণ করে, যার ফলে ত্বকের নির্দিষ্ট অংশ সাদা হয়ে যায়।
এর পেছনে কিছু কারণ থাকতে পারে—
- জেনেটিক বা বংশগত কারণ: পরিবারে কারও থাকলে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
- অটোইমিউন সমস্যা: শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিজেই ত্বকের মেলানিন উৎপাদক কোষের ক্ষতি করে।
- মানসিক চাপ: দীর্ঘমেয়াদি স্ট্রেস বা উদ্বেগ থেকেও শ্বেতী রোগ হতে পারে।
- সৌরদগ্ধ বা ত্বকের ক্ষত: অনেক সময় সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি বা আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে শ্বেতীর দাগ দেখা দিতে পারে।
শ্বেতী রোগ কারা বেশি আক্রান্ত হয়?
শ্বেতী রোগ যে কারও হতে পারে, তবে—
- যাদের পারিবারিক ইতিহাস আছে, তাদের ঝুঁকি বেশি।
- সাধারণত ১০-৩০ বছর বয়সের মধ্যে বেশি দেখা যায়, তবে যেকোনো বয়সেই হতে পারে।
- পুরুষ ও মহিলা উভয়েরই হতে পারে।
শ্বেতী রোগের চিকিৎসা কী?
শ্বেতী রোগের এখনো সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য চিকিৎসা নেই। তবে কিছু চিকিৎসার মাধ্যমে দাগগুলো কমিয়ে আনা সম্ভব।
প্রচলিত চিকিৎসাগুলো হলো:
- ঔষধ ও ক্রিম: মেলানিন উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কিছু স্টেরয়েড ক্রিম ও ওষুধ ব্যবহার করা হয়।
- ফটোথেরাপি (PUVA বা UVB থেরাপি): বিশেষ ধরনের আল্ট্রাভায়োলেট থেরাপি প্রয়োগ করা হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে।
- সার্জারি: কিছু ক্ষেত্রে স্কিন গ্রাফটিং করা হয়, যেখানে সুস্থ ত্বক থেকে কোষ নিয়ে শ্বেতী আক্রান্ত স্থানে প্রতিস্থাপন করা হয়।
- কসমেটিক মেকআপ: যারা চিকিৎসা নিতে চান না বা সাময়িকভাবে দাগ ঢাকতে চান, তারা কভারিং মেকআপ বা ডাই ব্যবহার করতে পারেন।
শ্বেতী রোগ নিয়ে ভুল ধারণা দূর হোক
শ্বেতী রোগ কোনো অভিশাপ নয়, এটি একটি সাধারণ ত্বকের সমস্যা। যারা এই রোগে আক্রান্ত, তাদের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করা উচিত। সমাজের মানুষ যদি সচেতন হয়, তাহলে শ্বেতী রোগীরা হীনমন্যতায় না ভুগে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবেন।
শ্বেতী নিয়ে সবার সঠিক ধারণা থাকা দরকার, যাতে কোনো কুসংস্কার ছড়াতে না পারে। শ্বেতী রোগ ছোঁয়াচে নয়, এটি সংক্রামক নয়—এই সত্য সমাজে প্রচার করা জরুরি।
মোহাম্মদ নাসিম 















