এই মুহূর্তে দেশের সব থেকে বড় রাজনৈতিক দল হলো বিএনপি। আওয়ামিলীগ এর ভরাডুবির পর প্রায় ফাকা মাঠে গোল দেওয়ার সম্ভবনা ছিলো বিএনপির। যে সম্ভবনা নিজ হাতে নষ্ট করছে দলটির নীতিনির্ধারকেরা। যদিও এই ঘটনা এই প্রথম নয়, গত ২০ বছর ধরেই দেখা যাচ্ছে তাদের সিদ্ধান্ত গুলো সব সময়ই সেকেলে টাইপের হয়। এখন তারা শুরু করছে নির্বাচন চাই। যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন চান তারা। গুঞ্জন আছে এই বুদ্ধি তাদেরকে দেওয়া হচ্ছে ভারত থেকে। যদিও এই গুঞ্জনের পিছন শক্ত যুক্তি আছে কিন্তু আজ সে বিশ্লেষণে যাচ্ছিনা।
এখন কথা হলো কিভাবে দলটির নীতিনির্ধারকেরা ফাকা মাঠে গোল দেওয়ার অপূর্ব সুযোগ হাত ছাড়া করছে।
আমি ব্যক্তিগতভাবে সবসমই অনুভব করি বিইএনপি দুইটা জায়গায় পিছিয়ে। এক হলো তারা দেশের মানুষের ফিলিংস বোঝেনা আর এক হলো তারা এখনো পড়ে আছে সেই ২০০০ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। আওয়ামীলীগের পরই বাংলাদেশের সব থেকে বড় রাজনৈতিক দল ছিল বিএনপি। সব আসনে লোক দেওয়ার মত, সব জেলায় ব্যানার ধরার মত পর্যাপ্ত লোকবল ছিলো তাদের। অর্থাৎ আওয়ামিলীগ এর পরই বড় একটা সমর্থক গোষ্ঠি আছে বিএনপি’র। আবার আওয়ামীলীগের পতনের পর আওয়ামী সমর্থক দের কিছু অংশ ভোট দিত বিএনপি কে। সব কিছু মিলিয়ে আগামী নির্বাচন বিএনপির জন্য হতে পারত সাপে বর। কিন্তু ওইযে বললাম, ২০০০ সালের রাজনৈতিক বুদ্ধি আর দেশের মানুষকে না বোঝার কারণে বিএনপির সম্ভবনার গ্রাফ ধিরে ধিরে তলানিতে ঠেকছে।
কেনো আমি মনে করি বিএনপি সহজে ক্ষমতায় যেতে পারত?
জুলাই আন্দলোনের মুখে আওয়ামীলীগের ভরাডুবির পর দেশের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয় ডক্টর মুহাম্মদ ইউনুস এর হাতে। তো খুবই সহজ ব্যাপার যে ইউনুস স্যার সারাজীবন ক্ষমতায় থাকবেন না বা তার ক্ষমতার লোভ ও নেই। কারণ সারা পৃথিবীতে আগে থেকেই তার গ্রহণযোগ্যতা অন্য পর্যায়ে। বাংলাদেশের হাল ধরে থাকা বা না থাকাতে তার জনপ্রিয়তা বাড়া বা কমা নির্ভর করে না। সুতরাং সে ক্ষমতা আকড়ে ধরে থাকবে না এইটা বোঝার জন্য রকেট সাইন্স জানার প্রয়োজন নেই। তিনি আজ না হোক কাল নির্বাচন এর মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন এইটাই স্বাভাবিক। এখন অন্যন্য দল গুল যেভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারাও যদি সেই ভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেন তাহলে সেই নির্বাচন হবে অন্যন্য দল গুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ আর বিনপির জন্য সাপে বর। আজ না হোক কাল নির্বাচন হবেই, আর বিএনপি যেহেতু গত ১৫-১৭ বছর কথাই বলতে পারেনি তাই যতই তাদের সব আসনে প্রর্থী দেওয়ার মত সক্ষমতা থাকুক সেই সক্ষমতা এখন আর আগের মত গুছানো নেই সেটা বোঝায় যায়। তাই বিএনপি যদি দ্রুত নির্বাচন চাওয়ার বদলে নির্বাচনের আগের সময়টা কাজে লাগিয়ে নিজেদের দল পুনরায় গঠনে মনোযোগ দেয় তাহলে সেটাই হবে দেশের মানুষের কাছে তাদের ব্যাপারে একটা পজিটিভ নিউজ।
সেটা না করে মির্জা ফকরুল সাহেব নির্বাচন চান। যেখানেই উনি যাচ্ছেন, সাংবাদিক দেখলেই তার একটাই কথা নির্বাচন চাই। এই পর্যন্ত ঠিকই ছিলো। নির্বাচন সে চাইতেই পারে, এটা তো দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার। এখন নির্বাচন চাইতে গিয়ে তার প্রিয় উক্তি হলো “জনগণ নির্বাচন চায়”। কথায় আছেনা উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে। দেশের মানুষের চাক বা নাচাক সে অবলিলায় বলে বেড়াচ্ছে দেশের মানুষ সবার আগে নির্বাচন চায়।
একটা সময় ছিলো, যখন বিনোদন বা কোনো সংবাদ সারা দেশে প্রচারের এক মাত্র মাধ্যম ছিলো টিভি। অর্থাৎ টেলিভিশনে যা দেখানো হতো মানুষ তাই জানতো, তাই বুঝত আর সেটাই বিশ্বাস করত। তখন রাজনৈতিক দল গুলো যে বক্তব্য দিতো মানুষ সেটাতেই প্রোরোচিত হতো। তাই তখন সত্য হোক বা মিথ্যা হোক দেশের মানুষকে বোঝানোর জন্য একটা কথা বলে দিলেই হতো। কিন্তু এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। এখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে একটা ঘটনা ঘটলেও সেইটা সেকেন্ডে সারা দেশের মানুষ জেনে যায় তাও আবার ভিডিও সহ। এছাড়াও রয়েছে অনেক গুলো ফ্যাক্ট চেকিং মিডিয়া। এই প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে সোসাল মিডিয়ার কল্যাণে। বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষই এই সোসাল মিডয়ার অংশ। অর্থাৎ তারা জানে দেশের কোথায় কি হচ্ছে। এখন ফকরুল সাহেব সব জায়গায় গিয়েই গড়ে বলে বেড়াচ্ছে দেশের মানুষ সবার আগে নির্বাচন চায়, কিন্তু দেশের বেশির ভাগ মানুষ চাচ্ছে আগে দেশটা স্বাভাবিক হোক। তার প্রমাণ এই সোসাল মিডিয়া৷ দেশের বড় বড় ফেসবুক গ্রুপ আর পেইজ এর পোল গুলোর রেজাল্ট এর দিকে নজর দিলেই বোঝা যাবে ৮০-৯৫ শতাংশ মানুষ বলছে এখনি নির্বাচনের দরকার নেই। কিন্তু একটা দলের সর্বোচ্চ নিতিনির্ধারক হয়ে মির্জা সাহেব বলে বেড়াচ্ছে দেশের মানুষ নির্বাচন চায়। এতে করে মানুষের কাছে একটা ক্লাউন এ পরিণত হচ্ছেন তিনি। যে জনগণের দোহায় দিয়ে বলছে যে তার নির্বাচন চাচ্ছেন ঠিক তাদের কেই কুতুব বলে ব্যঙ্গ করছেন। বাহ!
কুতুব এর কাহিনি যারা জানেন না তাদের জন্য বলছি: মির্জা সাহেব কে তার দলের কেউ হয়ত বলেছেন যে ফেসবুক আপনার এই জনগণের দোহায় দিয়ে নির্বাচন চাওয়ার প্রতিবাদ করছে জনগণ। তখন মির্জা সাহেব তার উত্তরে বলেছেন “ফেসবুকে কিছু কিছু কুতুব জন্ম নিয়েছে” যাদের দোহায় দিয়ে গদি কামাবেন তাদের কে বলছেন কুতুব। এতেকরে সাধারণ মানুষের কাছে বিএনপির কদর কমে যাচ্ছে। একে তো জনগণ বুঝতে পারছে আপনি মিথ্যা বলছেন তার উপর সেই জনগণকেই আপনি গালি দিচ্ছেন। এইবার বুঝেন আপনার জনপ্রিয়তা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে। একটা দলকে লিড দিবেন কিন্তু সমালোচনা সহ্য করতে পারবেন না তা কি করে হয়? দেশের বেশিরভাগ মানুষ যা বলে তাদের কাছে ভাল সাজার স্বার্থে হলেও আপনাকে তাই বলতে হবে। যদি তার বিপরীত কিছু বলেন তাহলে আপনি হয়ে যাবেন ১৮ কোটির প্রতিদ্বন্দ্বী। আর আপনি তো খালি উলটা বলেননি, তাদের দোহায় দিয়ে মিথ্যা বলেছেন আবার তাদের কেই গালি দিয়েছেন। সামনের নির্বাচনে মানুষ মার্কা দেখে ভোট দিবে না। এইটা আগে চলত এখন চলে না। সামনের নির্বাচন হবে কম্পিটিটিভ। নির্বাচনের আগে সব দলকেই নিজেদের কে প্রমাণ করতে হবে দেশের মানুষের সামনে।
এখন বলি বিএনপি কি করতে পারত:
বিএনপি গত ১৬-১৭ বছর কথায় বলতে পারেনি। ২০১৮ এর নির্বাচনে সৈরাচারের স্বিকার দেশের জনগণ কিছুটা হলেও বিএনপির দিকে তাকিয়ে ছিলো। কিন্তু তারা নির্বাচন বৈকট করে হাত পা গুটিয়ে বসে থাকল। এই পেস্কৃপশন ভারত থেকে এসেছিলো কিনা সেটা আলাদা আলোচনা। এখন কথা হলো তারা নির্বাচন বৈকট করেছিলো। আচ্ছা যদি ধরি এইটা তাদের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত ছিলো, তাহলে কিভাবে একটা দেশের বৃহত্তর একটা রাজনৈতিক দল এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে? তারা কি এই ছোট্ট খেলা বোঝেনি যে তারা নির্বাচন বৈকট করলে আওয়ামী লীগ এর জন্য রাস্তা সুগম হবে। কারণ বিএনপি বড় দল হতে পারে কিন্তু তারা তো একমাত্র অপনেন্ট না। অন্য অপনেন্ট এর মাধ্যমে আওয়ামীলীগ নির্বাচন করে ফেলবে আর সহজেই পাশ করে যাবে এইটা কি তারা বোঝেনি? যদি দেশে মাত্র দুইটা রাজনৈতিক দল থাকত একটা আওয়ামী লীগ আর একটা বিএনপি তাহলে এমন হতে পারত যে বিএনপি নির্বাচনে না গেলে নির্বাচনই হবে না। কোনো রকম প্রস্তুতি ছাড়া পরিক্ষায় অংশগ্রহণ করলেও পাশ করার নুন্যতম চাঞ্চ থাকে, পাশ না করুক পরিক্ষা তো দেওয়া যায়। কিন্তু আপনি যদি পরিক্ষায়ই অংশগ্রহণ না করেন তাহলে আপনার জেতার চাঞ্চ ০%। আরে জেতা তো পরের কথা ৫ বছরের জন্য আপনি তো পড়াশুনাই করতে পারবেন না। এইদিকে দেশের মানুষ ভাবছিলো বিএনপি যদি পারে আমাদের কে এই সৈরাচারের হাত থেকে রক্ষা করতে।
যাইহোক, বিএনপি যদি বাচ্চা ছেলের মত নির্বাচন নির্বাচন বাইনা না করে নির্বাচনের আগে নিজের দলটা সংস্কার করত, দলের নেতা কর্মীদের গঠন মূলক সিলেবাসের মধ্যে আনতো তাহলে মানুষের কাছে গ্রহণযগ্যতা বাড়াতে পারত। বড় রাজনৈতিক দল হিসাবে একটা বড় ভোটের অংশ তারা আগে থেকে পাবে, তার উপর ভাল কাজ করে দেশের মানুষের কাছ থেকে ভোট আদায় করে নিতে পারত। তার সাথে আওয়ামিলীগ এর একটা বড় অংশের ভোট তারা পেত। সব কিছু মিলিয়ে আগামী নির্বাচন হতে পারত তাদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ।
বিএনপি আর একটা ভুল:
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় মির্জা ফখরুল সাহেব সাংবাদিকদের সামনে স্পষ্ট করে বললেন এই আন্দোলনের সাথে বিএনপি’র কোন সংশ্লিষ্টতা নেই। এই আন্দোলন পুরোপুরি ছাত্রদের। কিন্তু শেখ হাসিনা পালানোর পর বিএনপির সব নেতা নেত্রীর গর্ত থেকে বের হয়ে আসল আর বলতে শুরু করলো এই আন্দলোনের মাস্টার মাইন্ড নাকি বিএনপি। এখানেও সেই ২০০০ সালের থেরাপি। তারা ভাবে তারা যা কিছুই বলবে মানুষ তাই বিশ্বাস করবে। অথচ মির্জা ফকরুল সাহেবের সেই বক্তব্য ইন্টারনেটে ভাইরাল।
সব মিলিয়ে বিএনপির সামনে এখনো সময় আছে নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার। সামনের নির্বাচনে তাদের উচিত হবে জনগণের চাওয়া-পাওয়া বুঝে রাজনৈতিক অবস্থান মজবুত করা। শুধু “নির্বাচন চাই” বললে হবে না, নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতও থাকতে হবে মানসিকভাবে, সাংগঠনিকভাবে এবং বাস্তবভাবে।
শুভ কামনা বিএনপির জন্য
Md Nasim 










